হাওরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে সরকার

আগামী পাঁচ বছরে হাওরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ শুরু করেছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সিলেট সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান। বিএনপি’র মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

তিনি জানান, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।

ড. তিতুমীর বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল, পলি জমে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃষিতে কীটনাশকের অপব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরাঞ্চলের সংকট আরও গভীর হয়েছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানে সরকার ইতোমধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সংকটের স্থায়ী সমাধান চাই। সেই লক্ষ্যেই আগামী পাঁচ বছরে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হবে।’

অতীতে হাওরাঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত প্রকল্প নেওয়া হলেও মানুষের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পলি জমে নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্লুইসগেট অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং জলাবদ্ধতা বেড়েছে।

ড. তিতুমীর বলেন, ‘রাষ্ট্র যদি জনকল্যাণমূলক হয়, তাহলে মানুষের পাশে দ্রুত দাঁড়াতে হয়। আমরা সেই কাজটাই করছি।’

সাম্প্রতিক অকাল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোকে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে।

হাওরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, নদী ও খাল খনন, জলমগ্ন ও ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, হাওর উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ এবং সময়মতো শ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন ধানের জাত চাই, যাতে অকাল বৃষ্টির আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেন। একই সঙ্গে হারভেস্টার, ড্রায়ার ও অন্যান্য কৃষি সরঞ্জামের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।’

হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বহু দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরাগায়নেও প্রভাব পড়ছে। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে বিপুল পরিমাণ পরিযায়ী পাখি এলেও এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

ড. তিতুমীর বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট। কিন্তু অপরিকল্পিত কর্মকা-ের কারণে এর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, নতুন হাওর ও জলাশয়-সংক্রান্ত আইনের আওতায় কৃষি, মৎস্য, পানি সম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সভায় তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ছিল ‘লুটপাট ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক’। ফলে টেকসই সমাধান হয়নি, বরং সংকট আরও বেড়েছে।

কৃষকদের জন্য সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা বীজ, সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সেবা পাবেন। পাশাপাশি কৃষি পরিকল্পনাও সহজ হবে।

মতবিনিময় সভায় সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.