খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতে মানুষের ঢল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী , বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে নেমেছে সাধারণ মানুষের ঢল। 

নতুন বছরের প্রথম দিনেও জাতি যেন আনন্দ ভুলে ডুবে আছে শোক, স্মৃতি আর ভালোবাসার গভীর আবেশে। হাতে ফুল, মুখে দোয়া আর অশ্রুসজল চোখে মানুষ ছুটে আসছেন প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারতে।

আজ বৃহস্পতিবার ( ১ জানুয়ারি) সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা মানুষজন জিয়া উদ্যানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। শীতের ভোর উপেক্ষা করে কেউ এসেছেন বাসে, কেউ ট্রাকে, আবার কেউ দল বেঁধে হেঁটেই— একটাই উদ্দেশ্য, খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।

নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ থাকার পর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে যাওয়ার লেক রোড। জিয়া উদ্যানের প্রবেশমুখ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনে সহযোগিতা করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

এদিন সকালে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন এবং মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।

কবর জিয়ারতে আসা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন— এমন বহু সাধারণ মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে শ্রদ্ধা জানান। কারো হাতে ফুল, কারো চোখে অশ্রু, আবার কারো ঠোঁটে নীরব প্রার্থনা— সমাধিস্থল পরিণত হয় এক গভীর আবেগঘন মিলনস্থলে।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করে— তিনি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছেন। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছি তাঁর জানাজায় শরিক হতে পেরে। আজ যখন তাঁর মাজার জিয়ারতের সুযোগের কথা শুনেছি, তখনই ছুটে এসেছি তাঁর জন্য দোয়া করার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন একজন নির্ভেজাল, নিবেদিতপ্রাণ গণতান্ত্রিক নেত্রী, যিনি নিজের জন্য কিছু চাননি, বরং আজীবন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা বলেছেন।’

ইবি উপাচার্য আরো বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু সেই দলকে প্রকৃত অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। নেতৃত্বের চরম সংকটে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে ধীরে ধীরে দলের নেত্রীতে পরিণত হন এবং দলকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াকু শক্তিতে রূপ দেন।’

মিরপুর থেকে আসা মোতালেব মিয়া  বলেন, গতকাল রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের জন্য কবর জিয়ারত করতে পারিনি। তাই আজকে সকালে কবর জিয়ারত করতে এসেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ওপর যে ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন। তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি করা হয়েছে এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এইসব নির্যাতনের পরও তিনি কখনো মাথা নত করেননি। তিনি চেয়েছেন এ দেশের মানুষ যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। আমরা আমাদের মাকে হারালাম।’

চাঁদপুর থেকে আসা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের মানুষ নই। বেগম খালেদা জিয়াকে সবসময়ই ভালোবাসতাম। তাঁর নেতৃত্বে দেশের যে সময়টা কেটেছে, সেটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সোনালি সময় মনে করি। আজকে তাঁকে শ্রদ্ধা ও তাঁর জন্য দোয়া করতে পেরে ভালো লাগছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে আসেন তামান্না আক্তার। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী নারী নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা আর সম্মান থেকেই আজ দুই সন্তানকে নিয়ে দোয়া করতে এখানে এসেছি। তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব আজও বহু মানুষের অনুপ্রেরণা।’

আজকে খালেদা জিয়ার কবরের পাশে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অবিরাম উপস্থিতি যেন নীরবে ঘোষণা করে— একজন রাষ্ট্রনায়কের শারীরিক প্রস্থান কখনোই তাঁর আদর্শ, নেতৃত্ব ও প্রভাবকে মুছে দিতে পারে না। সময়ের ব্যবধান যতই বাড়ুক, স্মৃতির গভীরে তিনি রয়ে যান চিরকাল।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.