দেশে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে, এক মাসের কম সময়ের মধ্যে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, ঠিক সেই সময় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি মৌলিক নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বুধবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। তবে গ্রেড (ধাপ) রাখার কথা বলা হয়েছে আগের মতোই ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত হচ্ছে এবার ১ঃ৮, যা এত দিন ছিল ১ঃ৯.৪।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর এখন সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করা হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। এই অবস্থায় সরকারের সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে।
এই বেতন বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে চাপে পড়বে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাত। পোশাক খাতের এমনিতেই বেহাল দশা। এর মধ্যে এই পে স্কেল পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন শুরু হবে পোশাক শিল্প এলাকায়। ধুঁকতে থাকা গার্মেন্টস শিল্প অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। শুধু পোশাক খাত নয়, শ্রমঘন প্রতিটি শিল্প খাতে সৃষ্ট হবে অস্থিরতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ। শিল্প উদ্যোক্তারা এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবেন?
তৃতীয়ত, এই পে স্কেল বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবে। গবেষণায়, দেখা গেছে, প্রতিবার পে স্কেল ঘোষণার পর তিন দফায় বাজারে দাম বৃদ্ধি পায়। প্রথম ধাপে বাড়ে যখন পে স্কেল ঘোষণা করা হয় (যেটা বুধবার করা হয়েছে)। দ্বিতীয় ধাপে বাড়ে যখন এটা কার্যকর করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। আর তৃতীয় ধাপে বাড়ে যখন নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পাওয়া শুরু হয়।
অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবার পে স্কেলের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে শতকরা ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এবারের পে স্কেলের কারণে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণের বেশি হবে। এমনিতেই নিম্নআয়ের মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বাজারে গিয়ে আর্তনাদ করেন। জিনিসপত্রের দাম এখনই অস্বাভাবিক, বেশিরভাগ মানুষেরই নাগালের বাইরে। এর ওপর এই সিদ্ধান্ত বাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলবে। সরকার গত দেড় বছরে মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে পারেনি। দেশে এখন মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। নতুন পে-স্কেল চালু হলে মুদ্রাস্ফীতি ২০ থেকে পঁচিশ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
চতুর্থত, সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে উদ্বেগজনক হারে। চলতি বছরে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম রাজস্ব আয় হয়েছে। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বেতনসহ নির্বাহী খরচ মেটাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিতে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে, সেই বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি এই সুপারিশে। রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়তি করের বোঝা নেওয়ার সুযোগ নেই।
ঘুস-দুর্নীতি কমানো এবং সরকারি কাজে গতি আনার যুক্তিতে অতীতেও বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব সমস্যার খুব একটা সমাধান হয়নি। অনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংকটে থাকা অর্থনীতিতে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।-সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন