শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বিখ্যাত দর্শন হচ্ছে ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। বাস্তবতা হচ্ছে- সে সুযোগটি তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। তার আমলে দেশে নতুন করে ৩০ লাখ লোক দরিদ্র হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ঠিকভাবে দায়িত্ব সামাল দিতে নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা পরিষদ ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেন।
ব্যক্তি খাতের গড় বিনিয়োগ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন : ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ হার ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট পতনের ঘটনাটি ছিল গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।
১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি : শুধু যে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, সরকারি বিনিয়োগ গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগ হিসেবে প্রচলিত এডিপি বাস্তবায়নের হার জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। গত ১০ বছরে এর চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।
মজুরি হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি : ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। দেখা যাচ্ছে, ভোক্তার মজুরি বাড়ার হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। এ কারণে মানুষের আয়ের চেয়ে খরচ হচ্ছে বেশি। কমেছে ক্রয়ক্ষমতা। অথচ মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বেড়েছে ব্যবসাবাণিজ্যে পরিচালন ব্যয়।
অর্থনীতির সব সূচকে যখন বিপর্যয় নেমে এসেছে তখন বেড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বিদায়ি ভাষণে এ রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়টি গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যাওয়ার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে, আমরা অবস্থার মোকাবিলা করতে পেরেছি।
প্রতিশ্রুতি, দায় ও সুবিধা গ্রহণ : দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে ড. ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করবেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করবেন, যার লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া তিনি তার দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। তার আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতির অভিযোগ তার সরকারের উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করাও হয়েছে। দুদক অভিযোগ তদন্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন তা নিয়েও রয়েছে জনমনে সন্দেহ ও বিস্তর প্রশ্ন। এমনকি তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদে আসীন থেকে তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কর ছাড়াসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ ও সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরকারি অনুমোদন ও বিশেষ সুবিধা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি।
সচেতন মহলের অভিমত, ড. ইউনূস বিদায়ি ভাষণে কতগুলো অধ্যাদেশ জারি করেছেন আর কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা প্রচার করলেও এসব সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে কোনো জবাব দেননি। ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্বে থাকলেও তিনি দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি।
কেবলমাত্র তার পছন্দের কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ১১টি সংস্কার কমিশন করে হাজার হাজার পৃষ্ঠার সুপারিশ নিয়ে রাষ্ট্রের টাকায় ঢাউস সাইজের গ্রন্থ প্রণয়ন করলেও সেসব সংস্কারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি। তার আমলে দেশের দুটি প্রধানসারির গণমাধ্যমে ভিতরে সাংবাদিক রেখে মব সৃষ্টি করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।