এই চুক্তির ফলে মুসলিমপ্রধান এই দেশে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, বলোগনা/বলোগনে, ব্র্যাটউরস্ট, ক্যাপিকোলা/ক্যাপোকোলা, চরিজো, কিলবাসা, মরটাডেলা, প্যানসেটা, প্রসিউটো এবং সালামে/সালামির মতো নানা পদের শূকরের মাংস আমদানির অবাধ সুযোগ প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। এই চুক্তিকে ইতিমধ্যেই দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আনু মুহাম্মদসহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পুরো চুক্তিটি আরও ভয়াবহ। এই চুক্তি একটি দাসত্বের দলিল। চুক্তিপত্রে কেবল পণ্যের শুল্ক নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড শীর্ষক এই চুক্তিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এসেছে ৫৯ বার। অথচ বাংলাদেশের নাম এসেছে ২০৫ বার। মূলত বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিপত্রে। চুক্তির পরিশিষ্ট ২ তে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশগম? পণ্যের তালিকা আছে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, চরিজো, কিলবাসার মতো শূকরের মাংস। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বা বৈধ উপায়ে শূকরের মাংস আমদানি করা যায় না, কারণ এটি আমদানি নীতি অনুযায়ী নিষিদ্ধ। অথচ এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য হারাম এই মাংস আমদানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রতিযোগিতা মূল্যে বিশ্ব বাজার থেকে উড়োজাহাজ কেনার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কার্যত বিমান পুরোপুরি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে গেছে এই চুক্তির আওতায়। এই চুক্তির ফলে বিশ্ব বাজার থেকে, বিশেষ করে কাতারের মতো দেশ থেকে স্বল্প মূল্যে এবং বাকিতে এলএনজি আমদানির পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। বেসরকারি পর্যায়েও তা কেনা হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৫ বছরে জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
এই চুক্তির ফলে, বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে-প্রতিবছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।
এ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামরিক খাতে কেনাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। তবে কোন কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। এতে সামরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে। ডব্লিউটিওর ভর্তুকি ও পাল্টা ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির বিধান অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক। এর ফলে বাংলাদেশকে কৃষি, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ভর্তুকি কমাতে হবে।
এই বাণিজ্য চুক্তি চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি বা অন্য কোনো দেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে-এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কেনার ওপর কড়াকড়ি আরোপের শর্তও রাখা হয়েছে।
সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন