ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। এতে করে বহু বাংলাদেশির মধ্যে আবারও সেই সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা জেগেছে।
গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কর্মী আজিজুর রহমান মুসাব্বির গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। তার এই মৃত্যুর খবর যখন ঢাকায় বিএনপির ছাত্র সংগঠনের নেতা কাজী শাওন আলম জানতে পারেন, তখনই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার চালানো কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
মুসাব্বিরের মৃত্যু শাওনের কাছে ছিল ব্যক্তিগত ক্ষতি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে—যে সরকার বিরোধী দমনে গণগ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত—শাওন চারবার মুসাব্বিরের সঙ্গে কারাগারে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে ১৭ জুলাই ২০২৫, আগের দিনের সহিংস সংঘর্ষে নিহত ছেলের জন্য শোক প্রকাশ করছেন এক মা। ছবি: এপি
শেখ হাসিনার সমর্থকদের হামলার প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিন্দা জানাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা। ছবি: এপি
বাংলাদেশের স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যে মতে, ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নিহত রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে মোল্লা ছিলেন ১৬তম।

শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় অংশ নিতে সংসদ ভবন এলাকার বাইরে জড়ো হয়েছেন মানুষজন। ছবি: এপি
এ ঘটনার পর দেশজুড়ে অস্থিরতা ও নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দেয়।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর সিঙ্গাপুর থেকে দেশে পৌঁছানোর পর ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া প্রথম আলো পত্রিকার কার্যালয়ের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন এক বিক্ষোভকারী। ছবি: এপি
এদিকে, মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশজুড়ে অন্তত ৬২টি নির্বাচন-সম্পর্কিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
পরিচিত এক ইতিহাস
ঢাকাভিত্তিক সেন্টার ফর অলটারনেটিভস পরিচালিত বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির (বিপিও) তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে ওঠানামা করেছে।
নির্বাচনের আগে ও পরে নির্দিষ্ট সময় ধরে হিসাব করে বিপিও জানায়—১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৪৯ জন, ২০০৮ সালে ২১ জন, ২০১৪ সালে ১৪২ জন নিহত হন।
এছাড়া ২০১৪ সালের নির্বাচনটি বিএনপি ও জামায়াত বর্জন করেছিল।
শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধীদের মতে ছিল একতরফা।
তবুও সহিংসতা থামেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে মাত্র চার দিনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ৪৭টি সহিংস ঘটনার নথি করেন, যাতে আটজন নিহত ও ৫৬০ জনের বেশি আহত হন।
২০১৪ সালের ভোটের দিনই অন্তত ২১ জন নিহত হন এবং প্রায় ৪০০ কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করতে হয়।
এই ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন হাসিনার পতনের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আগে ভীতি এখনো প্রবল।
দলের ভেতর থেকেই হুমকি
কিছু এলাকায় সহিংসতার উৎস রাজনৈতিক দলের ভেতরেই।
মধ্যাঞ্চলীয় জেলা টাঙ্গাইলে বিএনপির ছাত্র সংগঠনের ২৪ বছর বয়সী নেতা তুষার খান বলেন, এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার পর তিনি থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।
আল জাজিরাকে তুষার বলেন, ‘তারা বলেছে, আমি প্রচারে থাকলে আমার হাত-পা ভেঙে দেবে।’
এই বিরোধের কেন্দ্র একটি আসন, যেখানে সাবেক এক বিএনপি মন্ত্রী দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন। তুষারের অভিযোগ, ভোটের দিন প্রতিপক্ষের সমর্থকদের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখতেই এই ভয় দেখানো।
অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ হুমকির কথা স্বীকার করলেও অভিযোগ খারিজ করেন। তিনি বলেন, ‘সে আমাদের প্রার্থীকে অপমান করেছে, উসকানি দিলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৭৯টি আসনে বিএনপির ৯২ জন নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। জামায়াতের রয়েছে একজন বিদ্রোহী প্রার্থী।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা আসনগুলোতেই সহিংসতার ঝুঁকি বেশি।
শুধু শনিবারেই চার জেলায় বিএনপি প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।
বিএনপি বনাম জামায়াত: রাজপথে সংঘর্ষ
পুলিশের দিকে পাথর নিক্ষেপ করছেন বিক্ষোভকারীরা।
ছবি: রয়টার্স
প্রচারণা জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর এক দিন আগে, গত ২০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার মিরপুর এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত এক ডজন মানুষ আহত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, জামায়াতের দুই নারী কর্মী প্রচারের অংশ হিসেবে ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ এক বিএনপি নেতার বাসায় গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।
ঘনবসতিপূর্ণ ওই আসনে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতিতে বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতি রয়ে গেছে।
সংঘর্ষস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ ভোটারদের জন্য এটা সত্যিই ভীতিকর পরিস্থিতি। আমরা সংঘর্ষ চাই না, শান্তিতে ভোট দিতে চাই।’
বিএনপি ও জামায়াত—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছে।
জামায়াত নেতা জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, আমাদের ভয় তত বাড়ছে। সারা দেশে আমাদের কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, মিরপুরে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে।’
অন্যদিকে, বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়ে যুক্ত নেতা সাইমুম পারভেজ অভিযোগ করেন, জামায়াত কর্মীরা অবৈধভাবে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছে।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এর কিছু কিছু হতে পারে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনকে ব্যাহত করা।’
তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে অনলাইনে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেন এবং সতর্ক করে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ বলে ধারণা তৈরি হলে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
উৎসবের মতো নির্বাচন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কঠিন
পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে সংঘর্ষ ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে।
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার নামাজের পর বাড়ি বাড়ি প্রচারণার সময় দুই স্থানে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরা মুখোমুখি হয়ে পড়েন, পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘অনেক বছর পর নির্বাচন আবার উৎসবের মতো লাগছে। সাধারণ মানুষ বেশি যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু এতে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বেড়েছে। পুলিশ একসঙ্গে সব জায়গায় থাকতে পারে না।’
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতায় লুট হওয়া কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সহিংসতায় এগুলোর ব্যবহার ঠেকানো আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) জানান, গত ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনের নিরাপত্তায় ৯ লাখ কর্মী মোতায়েন থাকবে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ৭৩০ জন সামরিক সদস্য।
কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের ৪২,৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকেরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেখানে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষ প্রসঙ্গে শাহাদাত হোসেন বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ঘটনাগুলোকে অপরাধ হিসেবেই তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করবে।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের তুলনায় এবার সহিংসতা এখনো কম, কারণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার হয়েছে।
রোববার ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে শক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্রিফিং চলাকালেই স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, উত্তরের লালমনিরহাট জেলায় প্রচার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে, নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা শনিবার তার সমর্থকদের অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান, যা ভোটের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সূত্র: আল-জাজিরা